নিশিপদ্ম
কাহিনি সংক্ষেপ:মায়ের মৃত্যুর পর ভুতু যেন বড্ড একা হয়ে...
Also Available in:
- Amazon
- Audible
- Barnes & Noble
- AbeBooks
- Kobo
More Details
কাহিনি সংক্ষেপ:
মায়ের মৃত্যুর পর ভুতু যেন বড্ড একা হয়ে পড়ে। সৎ মা-এর কাছেও সে যেন চক্ষুশূল। মাতৃস্নেহের কাঙাল ভুতু পায় না তার পিতার সান্নিধ্যও। অভাবের সংসারের জোয়াল কাঁধে টেনে প্রাণপণ লড়াই করে চলেছেন ভুতুর বাবা। তবুও সৎ মা-এর ঘরে সন্তানের অযত্ন বেশ ভালোভাবে বোঝেন তিনি। অন্যদিকে স্বামীকর্তৃক বিতাড়িতা পুষ্প বোঝেনা তার অপরাধ। সে ফিরে যায় তার বৃদ্ধা মা-এর নির্জীব কুটিরে।
কিন্তু গ্রামীণ সমাজ তাকে প্রত্যাখান করে। অগত্যা জীবিকার তাগিদে পথে নামতে হয় পুষ্পকে। ভাগ্যের ফেরে তার ঠাঁই হয় শহুরে গণিকালয়ে। যুবতী পুষ্পর অন্তরে-অন্দরে সর্বদা সুপ্ত থাকে মাতৃত্ব। তার এই মাতৃত্ব আরও প্রগাঢ় হয় ভুতুকে কাছে পেয়ে! অচেনা এই পুষ্পকে ভালোবেসে তাই দূরে চলে যেতেও কার্পণ্য করেন না এক চিমটি শান্তির তৃষ্ণায় তৃষিত অনঙ্গবাবু। এভাবেই নিশিপদ্ম হয়ে ওঠে মাতৃস্নেহ বঞ্চিত শিশু এবং সন্তানহীনা বারবণিতার এক অপরূপ উপাখ্যান।
______________________
ভূমিকা
সুদীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে আড়ালে থাকা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর একটি ‘রচনা’ হচ্ছে–নিশিপদ্ম। ‘রচনা’ না বলে ‘উপন্যাস’ হিসেবে আখ্যা দেওয়াই সমীচিন হবে বলে বোধ করি। শুরুতেই উপন্যাসটি নতুন করে আবিষ্কার করার গল্পটি জানিয়ে রাখি। এতে পাঠকমনে জেগে ওঠা নানান প্রশ্নের উত্তর খুব সহজেই দেওয়া হয়ে যাবে।
নভেম্বর, ২০২৩ এর শেষ দিকের ঘটনা। হিমের পাতলা চাদর জড়ানো এক সন্ধেবেলায় সতীর্থের রিসার্চ হেড ও সহ-সম্পাদক আবু আনন্দ নিটু সাহেব খুব হন্তদন্ত হয়ে অফিসে এসে কম্পিত কণ্ঠে বলেন, “ভাই বিভূতিভূষণের নতুন একটা লেখা পেয়েছি।”
কম্পিউটার স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই বলি, “অসমাপ্ত অনেক কিছুই তো আছে। এত উত্তেজিত হওয়ার কী আছে?”
সে দ্বিগুণ উত্তেজনা নিয়ে বলে, “অসমাপ্ত না! নতুন লেখা! কোথাও নাই! একক বই তো দূরের কথা, সমগ্রতেও এই লেখা নাই।”
এইবার বাধ্য হয়েই তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখি বেচারার ফরসা মুখ উত্তেজনাতে লাল হয়ে আছে। তার ভাষ্যমতে–
১৯৮০ সালে ভারতীয় প্রকাশনা সংস্থা ‘উজ্জ্বল সাহিত্য মন্দির’ থেকে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ‘মনোরমা’ নামে একটি বই প্রকাশ পায়। যার দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশ পায় ১৯৮৬ সালে। বইটিতে একটি উপন্যাসসহ আরও আটটি গল্প রয়েছে। যেখানে লেখকপুত্র তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়-এর একটি ভূমিকাও রয়েছে; সেখানে বর্ণিত রয়েছে যে ‘নিশিপদ্ম’ আর কোথাও প্রকাশ পায়নি এবং উক্ত সাহিত্যকর্মটি লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এঁর একটি অনুদঘাটিত লেখা।
বইটির খোঁজ পাওয়া গেছে ‘লাইটহাউজ বুকশপ’ নামে বাংলাদেশের একটি পুরাতন বই বিক্রয়ের ফেসবুক পেইজ থেকে। যেখানে বইয়ের সূচিপত্র ও তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ভূমিকাটির পৃষ্ঠার ছবি দেওয়া আছে। সূচিপত্রে ‘নিশিপদ্ম’ নামটির পাশে ব্র্যাকেটে উপন্যাস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৭০ সালে উপন্যাসের নামেই মহানায়ক উত্তম কুমার ও সেই সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় অভিনীত একটি বাংলা সিনেমা মুক্তি পায় এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে দুই বছরের মাঝেই ১৯৭২ সালে একই সিনেমা হিন্দিতে ‘অমর প্রেম’ নামে রিমেক করা হয়। যেখানে সেই সময়ের বলিউডের সুপারস্টার রাজেশ খান্না ও শর্মিলা ঠাকুর অভিনয় করেন। গুগল ঘাঁটাঘাঁটি করে যা জানতে পারি, ১৯৭০ সালে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ছোট গল্প ‘হিঙের কচুরি’ অবলম্বনে তৈরী হয় ‘নিশিপদ্ম’ শীর্ষক সিনেমা। যা পরিচালনা করেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কিংবদন্তি লেখক বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়-এর ছোট ভাই এবং সত্যজিৎ রায়-এর বন্ধু অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়।
সেই সন্ধ্যাবেলায় সবটা শুনে এবং সেই ফেসবুক পেইজের ছবিগুলো দেখে বেশ খানিকটা হতবিহ্বল হয়ে পড়ি। অনেকগুলো প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেতে শুরু করে। কিন্তু বইমেলা ২০২৪ তখন দরজায় কড়া নাড়ছে। তাই আনন্দ ভাইয়ের সাথে কিছুক্ষণ আলাপ করে বইমেলার কাজে ব্যস্ত হয়ে যাই।
বইমেলা ২০২৪ শেষে, মার্চের মাঝামাঝিতে পুরানো বই বিক্রয়ের ফেসবুক পেইজ লাইটহাউজ বুকশপ-এর সাথে দীর্ঘ সময় যোগাযোগ করে ‘মনোরমা’ বইটির অরিজিনাল কপি সংগ্রহ করা হয়। নানান চেষ্টাচরিতের পর বইটি যখন হাতে পাই, তখন জানতে পারি, বইটি বিগত কয়েক মাস যাবৎ রাজশাহী শহরেই ছিল! এরপরেই শুরু হয় ভারতের বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগের প্রচেষ্টা।
প্রথমে যোগাযোগ করা হয় বইটির প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘উজ্জ্বল সাহিত্য মন্দির’ এর বর্তমান পরিচালক মহোদয়ের সাথে। মুঠোফোনের নম্বরে কয়েকদফা প্রচেষ্টার পরে তাঁর সাথে হোয়াটস্যাপে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। পুরোটা শুনে তিনি কিছুদিন পরে যোগাযোগ করার আশ্বাস প্রদান করেন।
এর মাঝে বিভূতিভূষণ-এঁর পরিবার তথা তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়-এঁর পরিবারের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে বইটির ব্যাপারে সবিস্তরে তাঁদের সাথে আলোচনা করা হয়। বেশ অবাক করা ব্যাপার এই যে, তাঁরা এই বইটির বিষয়ে জানতেন না। আমাদের থেকেই প্রথম বইটির ব্যাপারে তাঁরা জানতে পারেন। তবে তাঁরা ভূমিকাটি পড়ে এতটুকু নিশ্চিত করেন যে বই এ প্রদত্ত ভূমিকাটি তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়-এঁরই লেখা। বইটির মূল কপি এখন তেমন সহজলভ্য নয় কিংবা চাইলেই পাওয়া যাবে–এমনটা না, তাই পুরো লেখা পড়ে তারা একটা মন্তব্য করবেন, সেটিও সম্ভব হয়নি।
এরই মাঝে উজ্জ্বল সাহিত্য মন্দির-এর বর্তমান পরিচালক মহোদয়ের সাথে আবারও যোগাযোগ হয়। এইবার তিনি বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য প্রদান করেন। যেহেতু সেই তথ্যগুলো যথেষ্ট গোপনীয়, তাই সেগুলো জনসম্মুখে প্রকাশ না করার আশ্বাসে এতটুকু নিশ্চিত করেন যে, মনোরমা বইতে প্রকাশিত ‘নিশিপদ্ম’ উপন্যাসটি পাণ্ডুলিপি আকারে লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় উজ্জ্বল সাহিত্য মন্দির-এর তৎকালীন প্রকাশক কিরীটি কুমার পাল-এর নিকট জমা দেন। যা পাণ্ডুলিপি আকারে দীর্ঘদিন কিরীটি কুমার পালের নিকট সংরক্ষিত ছিল এবং লেখকের অকাল মৃত্যু হলে আর সেই সময়ে প্রকাশ করেননি। কিন্তু কিরীটি কুমার পাল নিজের শেষ বয়সে এসে লেখক পুত্রের ভূমিকা সহ ‘মনোরমা’ বইটিতে সেই পাণ্ডুলিপির লেখাটি উপন্যাস হিসেবে সংকলিত করেন। এরপরেও সতীর্থের পক্ষ থেকে আরও অনেকের কাছে এই লেখাটির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে যোগাযোগ করা হয়।
বলা চলে দুই সপ্তাহব্যাপী এই বিষয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা হয়। যেহেতু এই লেখাটি লেখকের কোনো সমগ্র কিংবা একক বই আকারে কোথাও প্রকাশিত হয়নি, এমনকি মনোরমা নামের বইটিতেও প্রকাশ পেয়েছে লেখকের মৃত্যুর প্রায় ৩০ বছর পরে; যা বর্তমান সময় থেকে প্রায় চার দশক পূর্বের ঘটনা; তাই সঠিক তথ্য যাচাইয়ের উদ্দেশ্যেই বিভিন্ন উৎস হতে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়–যদি কোনো সুনির্দিষ্ট ও সঠিক তথ্য পাওয়া যায় এই আশায়।
বিভিন্ন তথ্যের খোঁজে থাকাকালীন সময়ে ‘হিঙের কচুরি’ ছোট গল্পের বিষয়টি বারংবার সামনে আসে। উইকিপিডিয়ার মতে ‘নিশিপদ্ম’ সিনেমাটি ‘হিঙের কচুরি’ অবলম্বনে বানানো। কিন্তু এই উপন্যাসটি পড়ার পরে এই ধারণা সম্পূর্ণরূপে বদলে যেতে বাধ্য।
প্রাসঙ্গিকভাবেই এখানে ‘হিঙের কচুরি’ গল্পটার বিষয়ে বলা প্রয়োজন। হিঙের কচুরি গল্পটি লেখক বিভূতিভূষণের জীবনঘনিষ্ঠ একটি ঘটনার প্রতিরূপ অনেকাংশে। একই সাথে লেখকের লেখা ‘বিপদ’ নামের গল্পটিও এখানে প্রাসঙ্গিক।
লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর সহপাঠি, বন্ধু এবং একই মেসের বাসিন্দা নীরদচন্দ্র চৌধুরী রচিত ‘দাই হ্যান্ড গ্রেট অ্যানার্ক’ প্রমাণ্য গ্রন্থের ‘বন্ধু বিভূতিভূষণ’ নামক একটি প্রবন্ধ থেকে জানা যায় যে, চার-পাঁচ বছর বয়সে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাবার সাথে কোলকাতায় এসে যে এলাকায় বসবাস শুরু করেন, সেই এলাকার একজন ভদ্রমহিলা শিশু বিভূতিভূষণকে খুব স্নেহ করতেন এবং শিশু বিভূতিভূষণও সেই মহিলার প্রতি বেশ অনুরক্ত ছিলেন। সেই মহিলা সন্ধ্যার সময় শিশু বিভূতিভূষণকে বলতেন, ‘বাছা, এইবার বাড়ি যাও। আমার বাবু আসিবেন।’
এই ঘটনার বহুবছর পরে বিভূতিভূষণ তার বন্ধু নীরদচন্দ্রের সাথে উক্ত এলাকাতে সেই মহিলাকে খুঁজতে যান। ততদিনে সেই এলাকাটি একটি পতিতালয়ে পরিণত হয় এবং সেই মহিলাকে খুঁজতে গিয়ে তারা বেশ বিব্রতকর ঘটনার সম্মুখীন হন।
যে ঘটনাটিকে ছোট কলেবরে ‘হিঙের কচুরি’ গল্প এবং বড় কলেবরে ‘নিশিপদ্ম’ উপন্যাস এবং সিনেমার প্রতিরূপ হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। সম্ভবত ‘নিশিপদ্ম’ উপন্যাসটির পাণ্ডুলিপির ওপরে ভিত্তি করেই ‘নিশিপদ্ম’ সিনেমাটি কিংবা এর চিত্রনাট্য তৈরী করা হয়েছে, যদিও এই ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য সতীর্থের হাতে নেই। তবে বইটির বিষয়ে খোঁজখবর করার সময়ে যে তথ্যগুলো উদঘাটন করা হয় তা সবই লেখক ও প্রকাশক কিংবা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ তথ্য; যা চাইলেও জনসম্মুখে উন্মুক্ত করার এখতিয়ার আমার নেই। কিন্তু সার্বিকভাবে প্রাপ্ত তথ্য ও সতীর্থের হাতে থাকা মনোরমা বইটি পড়ে এবং নিশিপদ্ম সিনেমা দেখার পরে এতটুকু নিশ্চিত হওয়া গেছে যে লেখাটি লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস; যা পাণ্ডুলিপি আকারে ১৯৮০ সালের পূর্ব পর্যন্ত অপ্রকাশিত ছিল।
সবশেষে এইটুকু না বললেই নয়, তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া হয়–সতীর্থের পক্ষ থেকে সংগৃহীত তথ্যে ভুলত্রুটি রয়েছে। তবুও বইটি প্রকাশের সবচেয়ে বড় যৌক্তিকতা ‘মনোরমা’ বইটিতে স্বয়ং লেখকপুত্র তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ভূমিকা এবং সেই বইয়ের সূচীপত্রে নিশিপদ্ম –এর পাশে ব্র্যাকেটে ‘উপন্যাস’ কথাটি। স্বয়ং লেখকপুত্র যখন নিশিপদ্মকে প্রকাশিত বইয়ে উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন; যার মূল কপি সতীর্থের হাতে রয়েছে, তখন এই বিষয়ে আর কোনো দ্বিধা থাকার কথা নয়। এই বিষয়টিকে মূখ্য ধরে বইটি প্রকাশ করা হচ্ছে। তবুও সতীর্থের পক্ষ থেকে যতটা সম্ভব বিস্তারিত জানার চেষ্টা করা হয়েছে এবং বলা যায় দীর্ঘদিন আড়ালে থাকার পরে–
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘নিশিপদ্ম’ উপন্যাস প্রথমবারের মতো একক গ্রন্থরূপে সতীর্থ প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হচ্ছে।
শুভেচ্ছান্তে
মো. তাহমিদুর রহমান
সতীর্থ নিবাস, রাজশাহী।
১৪ এপ্রিল, ২০২৪
- Format:Hardcover
- Pages:168 pages
- Publication:2024
- Publisher:সতীর্থ প্রকাশনা
- Edition:1st Solo Edition/Vintage Edition
- Language:ben
- ISBN10:9849907517
- ISBN13:9789849907510
- kindle Asin:9849907517









